"আপনাদের ইনস্টাগ্রাম নাই? আমি তো ফেসবুক কম চালাই।" — এই প্রশ্নটা এখন অনেক পেজের ইনবক্সেই আসে। আর অনেক সেলারের উত্তর হয়, "আছে, কিন্তু ওখানে তেমন পোস্ট দিই না।" কাস্টমার গিয়ে দেখে শেষ পোস্ট তিন মাস আগের, ধরে নেয় দোকান বন্ধ। ইনস্টাগ্রামে অনলাইন ব্যবসা করতে চাইলে প্রথম শর্তই হলো অ্যাকাউন্টটা জীবিত রাখা।
ফেসবুকে যারা বিক্রি করেন, তাদের অনেকেই ইনস্টাগ্রামকে "ছবি দেওয়ার জায়গা" ভাবেন। আসলে ওখানে একটা আলাদা ধরনের কাস্টমার আছে — তুলনামূলক কম বয়সী, ছবি দেখে সিদ্ধান্ত নেয়, কমেন্টের চেয়ে ডিএম বেশি করে। সবার জন্য ইনস্টাগ্রাম সমান কাজের না, সেটাও আগে বলে রাখি।
কোন প্রোডাক্টে ইনস্টাগ্রাম বেশি কাজ করে
আশেপাশের সেলারদের দেখে যা বুঝেছি:
- দেখতে সুন্দর জিনিস — জামা, গয়না, মেহেদি ডিজাইন, হ্যান্ডমেড, কেক, গিফট বক্স। ছবিই যেখানে বিক্রি করে।
- তরুণদের জিনিস — স্কিনকেয়ার, অ্যাক্সেসরিজ, ফোনের কভার।
- যেটার "আগে-পরে" দেখানো যায়। মেহেদির রং কেমন আসে, দুই দিন পর কেমন — এগুলো ইনস্টাগ্রামে খুব ভালো চলে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বা পাইকারি মালে ইনস্টাগ্রাম থেকে অর্ডার তুলনামূলক কম আসে বলেই আমাদের ধারণা — এটা মাপা হিসাব না, দেখা অভিজ্ঞতা। ওখানে সময় দেওয়ার আগে নিজের কাস্টমার কোথায় থাকে সেটা ভাবুন।
শুরুতে অ্যাকাউন্টটা ঠিকভাবে বানান
ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট দিয়ে ব্যবসা চালালে ইনসাইট দেখা যায় না, কন্টাক্ট বাটনও থাকে না। তাই:
- সেটিংস থেকে অ্যাকাউন্টটা প্রফেশনাল অ্যাকাউন্ট (Business) এ বদলে নিন। এটা ফ্রি।
- Meta-র Accounts Center থেকে ফেসবুক পেজের সাথে ইনস্টাগ্রাম লিংক করুন। তাহলে Meta Business Suite থেকে দুই জায়গার মেসেজ এক জায়গায় দেখা যায়।
- ইউজারনেম রাখুন পেজের নামের কাছাকাছি। পেজ "Maimuna's Mehendi" হলে ইনস্টাগ্রামে "maimunas.mehendi" টাইপ কিছু — যাতে কাস্টমার খুঁজে পায়।
সেটিংসের নাম আর জায়গা Meta প্রায়ই বদলায়, তাই কোনো অপশন না পেলে Instagram Help Center এ "switch to professional account" লিখে খুঁজে নিন।
প্রোফাইল: ১৫০ অক্ষরে দোকানের পরিচয়
ইনস্টাগ্রামের বায়োতে জায়গা খুব কম। কিন্তু নতুন কেউ এসে প্রথমে এটাই পড়ে। একটা মেহেদির পেজের জন্য নমুনা বায়ো:
অর্গানিক মেহেদি কোন 🌿 কম্বো অর্ডার সারা বাংলাদেশে ক্যাশ অন ডেলিভারি অর্ডার: ডিএম অথবা নিচের লিংক
তিনটা প্রশ্নের উত্তর এখানে: কী বিক্রি হয়, কোথায় পাঠানো হয়, কীভাবে অর্ডার করবে। কম্বো অনুযায়ী দাম বদলালে দাম বায়োতে না রাখাই ভালো।
হাইলাইট গুলো আসলে আপনার শোকেস। যেমন রাখতে পারেন: "দাম", "রিভিউ", "কীভাবে লাগাবেন", "ডেলিভারি"। নতুন কাস্টমার ডিএম করার আগেই অর্ধেক প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যায়।
কী পোস্ট করবেন — সবচেয়ে কমন ভুলটা আগে
সবচেয়ে বেশি যে ভুলটা দেখি: ফেসবুকের পোস্ট হুবহু ইনস্টাগ্রামে কপি করা। লম্বা ক্যাপশন, দাম, "ইনবক্স করুন"। ফেসবুকে যা চলে, ইনস্টাগ্রামে তা প্রায়ই চলে না, কারণ ওখানে মানুষ স্ক্রল করে চোখ দিয়ে, পড়ে কম।
যা বদলানো দরকার:
- গ্রিড একরকম রাখা। একই ব্যাকগ্রাউন্ড, একই আলো। প্রোফাইলে ঢুকলে যেন একটা দোকান মনে হয়, এলোমেলো গ্যালারি না।
- রিলস বেশি, ছবি কম। হাতে মেহেদি লাগানো, শুকানো, রং উঠে আসা — ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও ছবির চেয়ে অনেক বেশি মানুষের কাছে যায়। রিলস নিয়ে বিস্তারিত লিখেছি প্রোডাক্ট ভিডিও আর রিলস লেখায়।
- ক্যাপশন ছোট। প্রথম লাইনেই মূল কথা। দাম জানতে চাইলে ডিএম।
- কাস্টমারের ছবি রিপোস্ট। কেউ পণ্য ব্যবহার করে ছবি দিয়ে ট্যাগ করলে অনুমতি নিয়ে স্টোরিতে দিন। এটাই সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য রিভিউ।
ছবি তোলার নিয়ম নিয়ে আমাদের আগের লেখা মোবাইল দিয়ে প্রোডাক্টের ছবি তোলা এখানেও পুরোপুরি কাজে লাগে।
হ্যাশট্যাগ নিয়ে একটু বাস্তব কথা
অনেকে ৩০টা হ্যাশট্যাগ দিয়ে দেন। আমাদের মত হলো এতে লাভ কম, পোস্টও সস্তা দেখায়। ৩–৫টা প্রাসঙ্গিক ট্যাগই যথেষ্ট — যেমন #mehendi #mehendibd #organicmehendi #bridalmehendi। খুব সাধারণ ট্যাগ (#love, #instagood) দিয়ে বিদেশি দর্শক আসে, কিন্তু তারা তো আর অর্ডার দেবে না।
হ্যাশট্যাগ কতটা কাজ করে, সেটা Instagram নিজেও সময়ে সময়ে বদলায়। নিজের ইনসাইটে দেখে নিন কোন পোস্ট কোথা থেকে মানুষ পেয়েছে।
ডিএম থেকে অর্ডার: যেখানে সবাই আটকে যায়
ইনস্টাগ্রামে মেসেজ আসে, কিন্তু অনেক সেলার দেখেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা উত্তর দেন না, কারণ ফোনে ফেসবুকের নোটিফিকেশন দেখেন, ইনস্টাগ্রামেরটা না। কাস্টমার ততক্ষণে অন্য পেজে।
আমাদের নিয়ম তিনটা:
- সব মেসেজ এক জায়গায়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ — আলাদা আলাদা অ্যাপে দেখলে কোনোটা মিস হবেই।
- প্রথম উত্তর দ্রুত। পুরো দাম-ডেলিভারি না জানলেও "জি আপু, একটু দেখে বলছি" লিখে দিন। চুপ থাকার চেয়ে ভালো।
- অর্ডারের তথ্য একবারে চান। ইনস্টাগ্রামের কাস্টমার লম্বা চ্যাট পছন্দ করে না।
আমাদের অর্ডার মেসেজটা এরকম:
অর্ডার কনফার্ম করতে এগুলো দিন প্লিজ — নাম: মোবাইল নম্বর: পুরো ঠিকানা (থানা সহ): কোন কম্বো:
"থানা সহ" কথাটা ইচ্ছে করে লেখা। আমাদের নিজের হিসাবে দেখেছি, থানা ছাড়া ঠিকানা দিয়ে বুক করা পার্সেল ভুল কুরিয়ার জোনে চলে যায়, আর সেগুলো অনেক বেশি ফেরত আসে।
ফেসবুক না ইনস্টাগ্রাম — দুটো একসাথে চালানো যায়?
যায়, কিন্তু দ্বিগুণ খাটনি না করে। একটা সহজ ভাগ:
| কাজ | কোথায় আগে | কোথায় পরে |
|---|---|---|
| নতুন ডিজাইনের রিল | ইনস্টাগ্রাম | একই ভিডিও ফেসবুকে |
| দাম আর অফারের পোস্ট | ফেসবুক | ইনস্টাগ্রাম স্টোরি |
| কাস্টমার রিভিউ | দুটোতেই স্টোরি | হাইলাইটে জমা |
| বুস্ট/অ্যাড | ফেসবুক অ্যাডস ম্যানেজার | একই অ্যাড ইনস্টাগ্রামেও চলে |
অ্যাডের ব্যাপারে একটা কথা: Ads Manager থেকে একটা অ্যাড বানালেই সেটা ইনস্টাগ্রামেও দেখানো যায়, আলাদা বাজেট লাগে না। বুস্ট আর অ্যাডস ম্যানেজারের পার্থক্য নিয়ে লিখেছি এখানে।
স্টোরি: ছোট সেলারের সবচেয়ে সস্তা বিজ্ঞাপন
পোস্ট আর রিলস নতুন মানুষ আনে, কিন্তু যারা আগে থেকে ফলো করছে তাদের মনে রাখায় স্টোরি। চব্বিশ ঘণ্টা পর মুছে যায় বলে এখানে নিখুঁত হওয়ার চাপ নেই, আর সেটাই সুবিধা।
স্টোরিতে যা দিতে পারেন:
- আজকের প্যাকিং। টেবিলে সারি করা পার্সেল — পেজটা যে সচল, তার সবচেয়ে সহজ প্রমাণ।
- পোল আর প্রশ্ন। "পরের ডিজাইন কোনটা আনব — ক নাকি খ?" মানুষ উত্তর দিলে আপনার অ্যাকাউন্টের সাথে তার যোগাযোগ বাড়ে, আর আপনি জানেন কী চলবে।
- স্টক আপডেট। "লাল রংটা আর মাত্র কয়েকটা আছে" — সত্যি হলে তবেই লিখবেন।
- কাস্টমারের মেসেজের স্ক্রিনশট, নাম আর ছবি ঢেকে, অনুমতি নিয়ে।
স্টোরিতে "লিংক" স্টিকার দিয়ে সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপ বা ওয়েবসাইটে পাঠানো যায়। আর স্টোরির রিপ্লাই সরাসরি ডিএমে আসে — অনেক কাস্টমার সাহস করে নতুন মেসেজ শুরু করে না, কিন্তু স্টোরিতে একটা ইমোজি রিপ্লাই দেয়। সেই রিপ্লাইয়ের উত্তরে ভদ্রভাবে দাম জানিয়ে দিন। এভাবেও অনেক কথোপকথন শুরু হয়।
একটা জিনিস এড়িয়ে চলুন: দিনে বিশটা স্টোরি। ফলোয়াররা একটার পর একটা টোকা দিয়ে পার হয়ে যায়, কিছুই মনে রাখে না। দিনে দুই থেকে পাঁচটা যথেষ্ট।
কত দিনে ফল আসে?
সত্যি বলতে, নতুন ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে প্রথম মাসে অর্ডার হাতে গোনা আসাই স্বাভাবিক। ফেসবুক পেজে যাদের আগে থেকে ফলোয়ার আছে, তারা এই ধীর গতি দেখে হতাশ হয়ে ছেড়ে দেন। ছেড়ে দেওয়াটাই আসল ভুল।
ধৈর্য রাখার একটা সহজ উপায়: সপ্তাহে অন্তত তিনটা রিল আর প্রতিদিন একটা স্টোরি — এই ছোট লক্ষ্য দুই-তিন মাস ধরে রাখুন। তারপর ইনসাইট দেখে ঠিক করুন চালিয়ে যাবেন কি না।
আর মেসেজ যখন বাড়তে থাকবে, তিনটা অ্যাপ ঘুরে ঘুরে উত্তর দেওয়াটা সবচেয়ে বড় ঝামেলা হয়ে দাঁড়ায়। আমরা নিজেরা এই কারণেই সব চ্যাট এক ইনবক্সে আনা শুরু করেছিলাম — চাইলে আমাদের ইনবক্স সার্ভিস দেখে নিতে পারেন।