পেজ খুলতে পাঁচ মিনিট লাগে। নাম দিলেন, একটা লোগো বসালেন, কয়েকটা ছবি পোস্ট করলেন — ব্যস, "দোকান" রেডি। সমস্যা শুরু হয় তার পরে। প্রথম সপ্তাহে বন্ধুবান্ধব লাইক দেয়, দুই-একটা অর্ডার আসে, তারপর হঠাৎ সব চুপ।
আমরা নিজেরা একটা মেহেদির পেজ চালাই। শুরুর দিকে যে ভুলগুলো করেছিলাম, তার বেশিরভাগই এড়ানো যেত — যদি কেউ আগে বলে দিত। সেগুলোই এখানে লিখছি।
আগে প্রোডাক্ট, পরে পেজ
অনেকে উল্টোটা করেন। আগে সুন্দর নাম দিয়ে পেজ খোলেন, তারপর ভাবেন কী বেচবেন। এতে সময় নষ্ট হয়।
প্রোডাক্ট বাছাইয়ের সময় তিনটা প্রশ্ন নিজেকে করুন:
- মানুষ কি এটা বারবার কেনে? একবার কিনে দশ বছর চালায় এমন জিনিসের চেয়ে যেটা শেষ হয়ে যায়, আবার লাগে — সেটা ভালো। আমাদের মেহেদির কোন শেষ হয়, আবার অর্ডার আসে।
- কুরিয়ারে পাঠানো সহজ তো? কাঁচের জিনিস, খুব ভারী বা খুব বড় জিনিসে ডেলিভারি খরচ আর ভাঙার ঝুঁকি দুটোই বেশি।
- দাম কি এমন যে মানুষ ক্যাশ অন ডেলিভারিতে "দেখি তো" বলে অর্ডার করে, তারপর রিসিভ করে না? খুব কম দামের জিনিসে ডেলিভারি চার্জের তুলনায় লাভ থাকে না, আর রিটার্ন হলে পুরোটাই লস।
একটা সহজ হিসাব রাখুন: প্রোডাক্টের দাম থেকে কেনা দাম, প্যাকেজিং, কুরিয়ার চার্জ আর বিজ্ঞাপনের খরচ বাদ দিলে কত থাকে? আর দশটার মধ্যে একটা রিটার্ন হলে তখন কত থাকে? দ্বিতীয় হিসাবটাই আসল লাভ।
পেজ সাজানো: যতটুকু দরকার, ততটুকুই
কভার ফটো আর প্রোফাইল ছবিতে দিন খরচ করার দরকার নেই। কাস্টমার আসলে তিনটা জিনিস খোঁজে:
- দাম। পোস্টে দাম না লিখে "দাম জানতে ইনবক্স করুন" লিখলে অর্ধেক মানুষ আর মেসেজই দেয় না। আমরা দাম লিখে দেওয়ার পর মেসেজ কমেনি, বরং অর্ডারের মেসেজ বেড়েছে।
- ডেলিভারি চার্জ আর কতদিনে পৌঁছাবে। এটা পিন করা পোস্টে বা পেজের "About"-এ রাখুন।
- আসল কাস্টমারের রিভিউ। শুরুতে রিভিউ থাকবে না, স্বাভাবিক। প্রথম দশ-বিশজন কাস্টমারকে নিজে মেসেজ করে জিজ্ঞেস করুন জিনিস কেমন লেগেছে। অনেকেই ছবি পাঠিয়ে দেন। (অনুমতি নিয়ে পোস্ট করবেন।)
প্রথম অর্ডারগুলো কোথা থেকে আসবে
সত্যি কথা বলি — শুধু পোস্ট দিয়ে বসে থাকলে এখন আর অর্ডার আসে না। ফেসবুক নতুন পেজের পোস্ট খুব কম মানুষকে দেখায়।
শুরুতে যা কাজ করে:
- চেনা মানুষ থেকে শুরু। লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। প্রথম বিক্রি প্রায় সবারই পরিচিতদের কাছে হয়। তাদের বলুন কিনলে ফিডব্যাক দিতে।
- ছোট বাজেটে বিজ্ঞাপন। দিনে কয়েকশো টাকা দিয়ে শুরু করুন, একসাথে বড় টাকা ঢালবেন না। কোন ছবি বা ভিডিওতে মেসেজ বেশি আসে, সেটা দেখে নিয়ে তারপর বাজেট বাড়ান।
- ভিডিও। প্রোডাক্ট হাতে নিয়ে সাধারণ ফোনে তোলা ছোট ভিডিও প্রায়ই সুন্দর এডিট করা ছবির চেয়ে ভালো চলে। মানুষ দেখতে চায় জিনিসটা আসলে কেমন।
মেসেজের উত্তর: এখানেই বেশিরভাগ অর্ডার হারায়
আমাদের অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে বড় লিকটা হয় ইনবক্সে। কেউ "দাম কত?" জিজ্ঞেস করল, দুই ঘণ্টা পর উত্তর গেল — ততক্ষণে সে অন্য পেজ থেকে অর্ডার করে ফেলেছে।
কয়েকটা অভ্যাস করে নিন:
- দাম, ডেলিভারি চার্জ, সাইজ — এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আগে থেকে লিখে "সেভড রিপ্লাই" করে রাখুন।
- দিনে অন্তত তিনবার নির্দিষ্ট সময়ে ইনবক্স পুরো খালি করুন।
- যে কাস্টমার দাম জেনে চুপ হয়ে গেছে, পরের দিন একবার ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করুন। আমরা গুনে দেখেছি, এভাবে প্রতিদিন এক-দুইটা অর্ডার ফিরে আসে যেগুলো না হলে হারিয়েই যেত।
অর্ডার কনফার্ম না করে পাঠাবেন না
ক্যাশ অন ডেলিভারিতে সবচেয়ে বড় খরচ রিটার্ন। অর্ডার পাওয়ার পর একটা ফোন করুন বা মেসেজে নাম, ঠিকানা, প্রোডাক্ট আর মোট টাকা (ডেলিভারি চার্জসহ) মিলিয়ে নিন। ফোন না ধরলে পাঠানোর আগে আরেকবার চেষ্টা করুন। এক মিনিটের ফোন অনেক টাকা বাঁচায়। এটা নিয়ে আলাদা করে রিটার্ন কমানোর লেখাটায় বিস্তারিত লিখেছি।
কুরিয়ার আর টাকার হিসাব
শুরুতে একটা কুরিয়ারেই থাকুন, পাঁচটা নিয়ে ঝামেলা বাড়াবেন না। কোনটা বেছে নেবেন, সেটা নিয়ে কুরিয়ার তুলনার লেখাটা দেখতে পারেন।
আর একটা খাতা বা স্প্রেডশিট রাখুন — প্রতিদিন কয়টা অর্ডার গেল, কয়টা ডেলিভারি হলো, কয়টা ফেরত এলো, কুরিয়ার থেকে কত টাকা ঢুকল। মাস শেষে এই চারটা সংখ্যা দেখলেই বুঝবেন ব্যবসা আসলে লাভে আছে কিনা। অনেকে মাসের পর মাস চালিয়ে যান, পরে দেখেন বিজ্ঞাপন আর রিটার্নে লাভটা খেয়ে ফেলেছে।
শেষ কথা
প্রথম তিন মাস লাভের চেয়ে শেখার সময়। কোন প্রোডাক্ট চলে, কোন বিজ্ঞাপনে মেসেজ আসে, কোন এলাকা থেকে বেশি রিটার্ন হয় — এগুলো খাতায় লিখে রাখুন। এই তথ্যটাই পরে আপনাকে বড় হতে সাহায্য করবে।
প্রশ্ন থাকলে আমাদের মেসেজ করুন — যতটুকু জানি, বলব।